দান

—-সৌমেন সরকার

একমুঠো ভাতের জন্য মানুষকে কি কি কাজই না করতে হয়!দিনমজুরি,যুদ্ধ,অসামাজিক কাজকর্ম এমনকি নিষিদ্ধপল্লীরও সঙ্গী হতে হয়।আর এসবের মূলে আছে ওই একমুঠো ভাত।
নীহারিকা সেনগুপ্তের বাড়ীর বিশাল অবস্থা!আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে দারুণ পসার জমিয়ে বসেছেন মেমসাহেব।তাঁর স্বামী মারা গেছেন বছর দশেক হল।চার ছেলে-নবীন,শ্রীবাস,বুদ্ধদেব ও ভবেশ।প্রথম দুজন বিবাহিত।নবীনের এক ছেলে রাহুল,মাত্র সাত বছর বয়স।আর শ্রীবাসের একমাত্র কন্যা মণিমালা,মাত্র বছর চারেক বয়স।আদরকরে সবাই ডাকে রাই বলে।এই দুই ভাইই বাবার ব্যবসা সামলাচ্ছে মায়ের সাথে কাঁধে কাঁধ আর হাতে হাত মিলিয়ে।বুদ্ধদেব সবেমাত্র ডাক্তারি পাশ করে প্র্যাকটিস শুরু করেছে দিল্লীতে।নীহারিকা দেবী এখন তার বিয়ের কথা ভাবছেন।আর বাড়ীর সবথেকে আদরের ছোটকর্তা ভবেশ কলেজে পড়ে।ইচ্ছা আচ্ছে অঙ্কের প্রফেসর হবেন।তবে তিনি সাহিত্যিক আর একটু ভবঘুরে প্রকৃতির।সবমিলিয়ে বেশ হাসিখুশী-জমজমাট পরিবার নীহারিকা দেবীর।
একান্নবর্তী এমন পরিবার খুঁজে পাওয়া দুষ্কর,যেখানে বড় বৌমা শিউলি ঠিক যেন লক্ষ্মী আর মেজ বৌমা প্রিয়াঙ্কা যেন স্বয়ং সরস্বতী।
তাদের বাড়ীতে কাজ করে কালু আর তার বড় মেয়ে পুঁটি।ছোট মেয়ে ডলি সবে ক্লাস টু-তে উঠেছে।বাবা আর বড় মেয়ে সেনগুপ্ত বাড়ীতে কাজ করে সংসার ও ছোট মেয়ে ডলির লেখাপড়া চালায়।
পুঁটির বয়স বার হলেও সংসারের সকল কাজে এক্কেবারে পটুঁ।সকালে রান্নাবান্না করে সকলকে খাইয়ে ও নিজে খেয়ে সেনগুপ্ত বাড়ীতে কাজে বেরিয়ে পড়ে বাবার সাথে।দুপুরে এসে স্নানাহার সেরে আবার কাজে চলে যায়।রাতে ফেরে দশটা নাগাদ।ওদের বাড়ী থেকে নীহারিকা দেবীর বাড়ী মাত্র দশ মিনিটের হাঁটা পথ।পুঁটির সাথে রাহুল আর রাই-এর দারুণ ভাব।পুঁটির প্রধান কাজ মূলতঃ ওদেরকেই দেখাশোনা করা। বাপ বেটিতে যা মাইনে পায় তাতে হাসতে খেলতে তিনজনের সংসার চলে যায়।
ঘটনাটা ঘটল শ্রীবাসের একমাত্র শ্যালক কাঞ্চনের আসার ঠিক পরদিন।
কাঞ্চন প্রিয়াঙ্কার ছোট ভাই।সে একটু নষ্ট প্রকৃতির বাউন্ডুলে বকাটে ছেলে।বড়লোক বাপের বিগড়ে যাওয়া কুলাঙ্গার আর কি!
পুঁটিকে আজ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কাঞ্চনের গেস্টরুম পরিষ্কার করার।মেজ বৌমা প্রিয়াঙ্কা বলল-

“এই পুঁটি!কাঁচু মামা এসেছে জানিস তো।আজ ওর ঘরটা একটু সাফাই করে রাখিস।তেমন পরিষ্কার নয় ঘরটা।”

ভাই কাঞ্চনকে সে আদরকরে কাঁচু বলে ডাকে।মানে বাবার লাই এর সাথে সাথে দিদির আদরেরও তার বকাটে হবার পশ্চাতে যথেষ্ট অবদান আছে।পু্ঁটি মাথা নীচু করে বলল-

“আচ্ছা ঠিক আছে মেজ কাকিমা।আমি এখনই করছি।”

-“হ্যাঁ,তাই কর।হয়ে গেলে বলিস আমায়।”

পুঁটির মিষ্টি ও শান্ত স্বভাবের জন্য তাঁকে বাড়ীর সকলে খুব ভালোবাসে।কারও কোন প্রয়োজন হলে পুঁটির ডাক অবসম্ভাবী।
পুঁটি ঘর মুছতে ব্যস্ত এমন সময় কাঞ্চন নিঃশব্দে পুঁটির পিছনে এসে দাঁড়ায়।কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে যখন দেখল কেউ আসছে না তখন সে পুঁটির হাত টেনে ধরে।পুঁটি থতমত খেয়ে উঠতেই পিছনদিক থেকে পেটের ওপর দুহাত দিয়ে চেপে ধরে।তারপর পুঁটি সামনে ঘুরতেই কাঞ্চন ওকে সামনের দিক থেকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করে।পুঁটি তৎক্ষণাৎ কোনরকমে সেঘর থেকে পালিয়ে আসে।
(১)

তার সারা শরীর কাঁপতে থাকে থরথর করে।কিন্তু কাউকে কিছু বলার সাহস পায় না সে।কারণ,গরীবদের জন্য কোন আদালত যে নেই।তাদের কান্না চাপা পড়ে ধনীদের সম্পদের তলায়।
তবে এথেকে কাঞ্চনের সাহস দিন দিন বাড়তে থাকে।কেউ জানত না বলে তার স্পর্ধা আরও বেড়ে গিয়েছিল।
এই ঘটনার দিন সাতেক পরে যে মারাত্মক ঘটনাটা ঘটিয়ে বসে কাঞ্চন,তা ভাবলেই শরীরের রক্ত গরম হয়ে ওঠে!
ঘটনাটা বলি।
সবাই গেছে পিকনিকে।কিন্তু কাঞ্চন পেট খারাপের ভান করে থেকে গেছে বাড়ীতে।আর কাজ করতে রয়ে গেছে কালু আর পুঁটি।অবশ্য ওদের বলা হয়েছিল,কিন্তু ওরা যায়নি।
কালু আগের ব্যাপারটা কিছুই জানত না।তাই পুঁটিকে বাড়ীতে রেখে সে দুপুরবেলা চলে গেল বাজার করতে।
কাঞ্চন হাঁক দিল-

“এই পুঁটি!একটু চা দিয়ে যাস তো।”

পুঁটির হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল কাঞ্চনের কথা শুনে।সারাবাড়ী খুঁজেও বাবাকে পেলনা সে।তখন নিতান্ত নিরুপায় হয়েই চা নিয়ে গেল পু্টি।ঘরে ঢুকে দেখে ঘরে কেউ নেই।হঠাৎ খুট্ করে শব্দ হতেই দেখল দরজার কপাট বন্ধ করে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে কাঞ্চন!সে হাসিতে যেন লালা মেশানো।চোখের চাহনিতে শ্বাপদের উষ্নতা বিচ্ছুরিত হচ্ছে।তখন হাত থেকে চায়ের কাপ সশব্দে পড়ে গেল মেঝতে।কিছুক্ষণ খাটের চারপাশে বেড়াল-ইঁদুরের খেলা হল যেন।তারপর ক্লান্ত হয়ে পড়লে কাঞ্চনের বাহুডোরে বদ্ধ হয়ে পড়ে সে।খাটের ওপর প্রবল ধস্তাধস্তিতে জর্জরিত হয়ে পড়ে।পুঁটি অনুভব করে কাঞ্চনের শরীরে যেন অসুরের শক্তি ভর করেছে।কোনভাবেই তার নাগপাশ থেকে নিজেকে বন্ধনমুক্ত করতে পারছেনা।সে নওতান্তই নিরুপায়।ওদিকে কাঞ্চনের উত্তপ্ত নিঃশ্বাসে তখন প্রথম রিপুর বিষম উত্তাপ!কাঞ্চনের ঠোট নিমেষে শুষে নিচ্ছে পুঁটির কচি ঠোঁটের শেস রসবিন্দু।শেষে রক্তক্ষরণ শুরু হল পুঁটির ঠোঁট থেকে।তার শরীরও ধীরে ধীরে অবশ হয়ে পড়ছে যেন।তবুও শেষ চেষ্টা করতেই হবে।ও বারে বারে অনুনয়ের সুরে বলছে-

“আমার এমন সর্বনাশ করবেন না মামাবাবু।আপনি সম্পর্কে মামা হন,আর মামা তো বাবারই সমান।”

সে টোটকাতেও চিড়ে ভিজল না।কাঞ্চন কামের নেশায় জর্জরিত-চরম উত্তপ্ত হয়ে লালামিশ্রিত গলায় বলল-

“কিছু হবেনা পুঁটি…আমার পুঁটি…আয়…আরও কাছে…আজ মনের সব জ্বালা জুড়িয়ে দে!” আরও বেশী জোরে জড়িয়ে ধরে সে পুঁটিকে।
মুহূর্ত যখন চরম বিপদের তখন খাটের পাশে থাকা টেবিলের ওপর থেকে কি একট শক্ত বস্তু যেন পুঁটির হাতে ঠেকল।শরীরের সব শক্তি একত্রিত করে সেই বস্তুটা দিয়ে চরম আঘাত হানে কাঞ্চনের মাথায়।সে খাট থেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ক্রমশ।
ভয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল সে।বেচারি জানতেও পারলনা যে তার ফুলদানির আঘাতে তৎক্ষণাৎ মৃত্যু ঘটেছে কাঞ্চনের।
পুলিশ এসে তদন্ত শুরু করে ও পুঁটির ওপরেই সবার আগে সকলের সন্দেহ যায়।কারণ,ঘটনার পর থেকে সে নিরুদ্দেশ।পরে তদন্তে জানা যায় যে পুঁটিদের বাড়ীর সামনের রেল লাইনে রেলে কেটে মারা গেছে সে!মুণ্ডুহীন দেহের পোশাক দেখে কালুই তাকে সনাক্ত করে।তার অবস্থা শোচনীয়।কেঁদেকেটে একাকার করছে শুধু।
কিন্তু এর পিছনে থাকা প্রকৃত কারণটা ধামাচাপা পড়ে যায় সকলের অগোচরে।সকলে জানে কাঞ্চনকে খুন করে পুঁটি আত্মহত্যা করেছে।এমনকি আসল কারণটা পর্যন্ত খোঁজার দিকে কোন ভ্রূক্ষেপ নেই কারও।
(২)

এরপর সেনগুপ্ত বাড়ী থেকে কালুকে ছাড়িয়ে দিয়ে অন্য কাজের লোক রাখা হয়।কালু হাতে-পায়ে ধরে অনেক কাকুতিমিনতি করে,তবুও মন গলেনি সেনগুপ্ত পরিবারের কোন সদস্যের।যদিও সকলে কাঞ্চনকে হাড়ে হাড়ে চেনে।আসল ঘটনাটা যে কি তা আন্দাজ হয়ত সক্কলেই করতে পারছে।তবুও বাড়ীর সম্মান বাঁচাতে মৌন ব্রতই সঠিক মনে করেছেন তারা।কেবল রাহুল আর রাই কেঁদে বলেছে-

“পু্টি দিদি ভালো…ওকে এনে দাও…”

ভাগ্য ভালো এক বন্ধুরর সহযোগিতায় একটা ভ্যান ভাড়াতে পায় কালু।তাই দিয়েই কোন মতে চলে তাদের দুজনের সংসার।
হঠাৎ একদিন ডলি খুব অসুস্থ্য হয়ে পড়ে।ধুম জ্বর আর জ্বরের ঘোরে প্রায় বেহুঁশ হয়ে বারে বারে বলছে “দিদি!দিদি! বাবা,দিদি আমায় ডাকছে!আমি দিদির কাছে যাব…”
ডাক্তার ডেকে আনা হল।তিনি ওষুধ দিলেন।তবে কিছু খাবার পর তা খাওয়াতে হবে।খালিপেটে একদম নয়।ওর বয়স মাত্র আট বছর।ঘরে দাদাপানি বলতে কিছুই নেই।দোকানে আর বাজারে এত দেনা যে এমন চরম সঙ্কটজনক অবস্থাতেও কেউ সাহায্য করতে রাজী হবে না।
তখন কালু ছুটে গেল মনিব বাড়ীতে।সেনগুপ্ত বাড়ীর বাইরে দাঁড়িয়েই চেঁচাতে লাগল-

“দিদিমণি!একটিবার দয়া করুণ।মেয়েটা আমার না খেতে পেয়ে মরে যাবে!কিছু খাবার দিন…” বলে অঝোরে কাঁদতে থাকে।কিন্তু সেপরিবারের সকলের যেন পাষাণ হৃদয়।মুখের ওপরেই বলে দিল শিউলী-

“তোদের মত ভিখিরিদের এমন হওয়াই উচিৎ!যা,না খেতে পেয়ে মরুক মাগী!বর রস,তাই না!”

এত অপমান সত্ত্বেও বাড়ীত গিয়ে হাতে-পায়ে ধরে কেঁদেছে,তবুও পাথর গলাতে পারেনি এক হতভাগ্য পিতার করুন আর্তনাদ আর অশ্রু।ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিল এবং মুখের ওপর দরজা সপাটে বন্ধ করেদিল তখনই।
এবার বাড়ীর পিছনদিকে রান্না ঘরের পাশে গিয়ে জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে বলল-

“কিছু অন্তত দিন মা ঠাকরুণ।মেয়েটা আমার না খেতে পেয়ে মরে যাবে!”

তখনই একটা হাঁড়ি জানালা দিয়ে বাইরে চলে এল।শোনা গেল-

“এই নাই কালুকাকা,ডলি দিকে খাওয়াও।রাত হয়েছে তো,তাই ভাতে জল দেওয়া হয়ে গেছে।পান্তা করে রেখেছে!”

চমকে উঠল কালু!এতো ছোট দিদিমণি রাই-এর গলা।-“একশ বছর বাঁচুন ছোট দিদিমণি” এই আশীর্বাদ করে কালু হাঁড়িটা নিয়ে বেরিয়ে আসে।কিন্তু গেটের কাছে এসে হোঁচট খেয়ে পড়তেই হাতের অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িটাও সশব্দে মাটিতে আছাড় খায়।ওদিকে এই আওয়াজে সবাই “চোর! চোর!” করে সেনগুপ্ত বাড়ী থেকে বেরিয়ে পড়েছে ততক্ষণে।
ওদিকে কালু হাঁড়িটাকে কোনমতে তুলে ছুটছে বাড়ীর দিকে।বাড়ী আগে রেললাইন।ওখানে এসে চেঁচাতে লাগল-

“ওরে ডলি মা!এই দ্যাখ্!রাই দিদিমণি তোর জন্য পান্তা পাঠিয়েছে।এবার তুই ওষুধ খেয়ে ঠিক সেরে উঠবি দেখিস!”
(৩)

কালুর কথা শেষ হতে না হতেই রেললাইনের ওপর আবার হোঁচট খেয়ে পড়েছে সে।এবার কিন্তু ও ওঠার আগেই সেনগুপ্ত বাড়ীর লোকজন তাকে ধরে ঘিরে ফেলেছে।মিনিট পনের পর দেখা গেল সাদা পান্তা লাল হয়ে গেছে আর হাত-পা ছড়িয়ে উপুর হয়ে পড়ে আছে কালুর স্পন্দনহীন নিথর রক্তাক্ত দেহটা।কিছু দূরে পড়ে আছে অ্যালুমিনিয়ামের একটা হাঁড়ি।সবাই সরে যেতেই একটা প্যাসেঞ্জার ট্রেন চলে গেল কালুর দেহের ওপর দিয়ে।আর চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে লাল লাল পান্তাভাত!

পরদিন সকালে ডলির মৃতদেহ বের হল কালুর ঘর থেকে।ডাক্তার বললেন,দিন তিনেক কিছু খাওয়া হয়নি বাচ্চাটার…আর পেটে একফোঁটা ওষুধও পড়েনি…

বিভাগ:তথা

উচ্চারণ ওয়েব ম্যাগাজিন

কথাদের স্পর্ধা

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s