এগারো দিন

অরিজিৎ কুমার

“আজ সেদ্ধ বরবটি আর শশাকুচো দিয়ে মুড়ি মাখুন।” জানতে চেয়েছিলাম কি খাবো আজ রাত্রে, তার উত্তরে আমি বললাম মেনুটা। তারপর সরে এসে জামা, চশমা, নোসমাস্ক, কানের মুখোশ সব টেবলটপ ড্রাইওয়াশ মেশিনের রিসিভারে রাখতে লাগলাম। ওখান থেকেই শুনলাম আমি জিগ্যেস করছি আমাকে, “কেমন ছিল সপ্তাহটা?” একটু ভেবে বললাম “দিব্য”।
মেশিনটা প্রিহিট হতে দিয়ে আইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহলের ভালভটা খুলতে খুলতে একটু গলা তুলে বললাম “এগারোটা দিন কোথা দিয়ে যে কেটে গেল …  আপনি যে ব‌ইটা খুঁজতে বলেছিলেন, বেমালুম ভুলে গেছি।” ভালভের নিচেই জুতোর আলনা, তাই জুতোটা শাট ডাউন করে চটি পায়ে গলিয়ে জুতোটা যথাস্থানে রেখে দিলাম। ওদিক থেকে আমার গলা পেলাম, “রেডিয়াস কমা রেটের কিছু উন্নতি হল?”

এখানে বলে রাখি, ২০৪৬ থেকে পৃথিবীর রেডিয়াস কমতে শুরু করেছে। ২০২৪ নাগাদ সব দেশে ধর্মীয় সরকার ক্ষমতায় আসার পর সব দেশের নেতারা  মিলে সিদ্ধান্ত নেন সমস্ত অ্যালোপ্যাথিক ওষুধের উৎপাদন বন্ধ করে সবাইকে নেচারোপ্যাথিতে অভ্যস্ত করে তোলা হবে। যে টাকা বাঁচবে তা ভিনগ্রহ দখল নেওয়ার যুদ্ধাস্ত্র তৈরিতে কাজে লাগবে। বেশ কিছু নেতার মত ছিল, সাহিত্য, সিনেমা, খেলাধুলো ইত্যাদির ফলে পৃথিবী অপবিত্র হয়ে গেছে, তাই মন্দির, চার্চ, মসজিদ এসবের জন্য একটা অপাপবিদ্ধ গ্রহ চাই। নেচারোপ্যাথির ফলে জীবাণুরা অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। মানুষের হাতে তৈরি প্লাস্টিক হজম করা ব্যাকটিরিয়ারা সমস্ত পদার্থ‌ই হজম করতে সক্ষম হয়ে ওঠে নিজেদের অভিযোজিত করে। তাদের পরিপাক ক্রিয়ার পর পড়ে থাকে শুধু কণাস্রোত। ফলে পৃথিবীর ব্যাস ও ভর কমতে থাকে, যদিও দেশে দেশে ক্ষমতার গদিতে বসে থাকা ধর্মগুরু ও খামারমালিকরা তা মানতে চাননি। উল্টে সমস্ত গবেষণা কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়। সমস্ত গবেষক, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানীকে মেরে ফেলা হয় বা বন্দি করা হয়। আসলে বন্দি বিজ্ঞানীদের নেতাদের প্রয়োজনের অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ তৈরির কাজে লাগানো হয় গোপনে।  ২০৪৬ সালে পৃথিবীর আন্হিক গতি বৃদ্ধি ও দিন রাতের দৈর্ঘ্য কমে আসার ফলে বায়ুমন্ডলে
প্রবল উথালপাথাল হয়ে ১৪৭ টি ঘূর্ণিঝড় হয়। ফলে ২০৩২ সালের ১২৯০ কোটি জনসংখ্যা ৩০০ কোটিতে নেমে আসে। ওই ২০৪৬ কেই তাই রেডিয়াস কমার শুরুর বছর ধরা হয়। যদিও জিনিসটা আগে থেকেই শুরু হয়েছিল।

আমি উত্তর দিলাম “আপনি আশা করেন উন্নতি হবে?”  শুনলাম ওদিকে আমি বিড়বিড় করছি “আশায় বাঁচে চাষা”। সতর্ক হয়ে গেলাম। অর্থহীন কবিতা, ছড়া, প্রবাদ, কার্টুন, গান এসব ধর্মবিরোধী জনমত তৈরি করতে পারে বলে নিত্যপ্রয়োজনের কথা ছাড়া বাকি সব‌ই নিষিদ্ধ। আমি বললাম “আপনি কেমন কাটালেন সপ্তাহটা?”
-”আমার তো নিত্যদিনের এক‌ই কাজ, যে যেদিন আসে সেদিন তার ক্লোন হয়ে সঙ্গ দেওয়া।”
ধীরপায়ে গিয়ে চেয়ারে বসা আমার সামনে দাঁড়ালাম। আমার গালে হাত রাখলাম। উবু হয়ে বসতে, আমি ঠোঁট নামিয়ে আনলাম আমার ঠোঁটে।

২০৩৭ সালের ২৬শে জানুয়ারী দক্ষিণ এশিয়া সরকার তার নিরাপত্তা বাহিনীকে নির্দেশ দেয় সমস্ত মহিলাদের বন্দি করার। তার আগেরদিন সেদেশের সর্বোচ্চ কোর্ট রায় দেয় যে, মহিলারা মানবজাতির অপবিত্রতার উৎস। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সারা পৃথিবীর সব দেশ‌ই এক‌ই ভাবে মহিলাদের বন্দি করে। বিভিন্ন দেশের ধর্মীয় নেতা ও খামারমালিকরা এই মহিলাদের ইচ্ছেমত তুলে নিয়ে যায় নিজেদের প্রাসাদে। পুরুষশিশু উৎপাদন হতে থাকে বিভিন্ন জেনেটিক উৎপাদনকেন্দ্রে। তবে ২০৪৬ এর আগে
শিশু উৎপাদন বন্ধ‌ই ছিল একরকম। কেবল উচ্চ পর্যায়ের ধর্মগুরুদের প্রাসাদ থেকে মাঝে মাঝে শিশুর অর্ডার আসত। বাকি বাসিন্দাদের জন্য নিজের ক্লোনের সঙ্গ নেওয়ার রায় দেওয়া হয়।

তৃপ্ত শরীরে শুয়েছিলাম। এখন সূর্য ডুবছে। ৯ ঘন্টা পরেই আবার উঠবে। সপ্তাহের প্রথমদিনের রোদ পিঠে মেখে আমাকে বিদায় জানিয়ে ইউরেনিয়াম তোলার খনিতে কাজ করতে র‌ওনা দেব। আবার দেখা হবে এগারো দিন পরে।

বিভাগ:তথা

উচ্চারণ ওয়েব ম্যাগাজিন

কথাদের স্পর্ধা

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s