অভিশাপ

রিঙ্কি বোস সেন

আড়িপেতে কথাগুলো শুনেই বাবুই তরতর করে উপরে উঠে গিয়ে বাসায় ঢুকলো, তার গিন্নী যেখানে দুটো সদ্যজাত বাচ্চাকে বুকের ওম দিয়ে আগলে শুয়ে আছে।
__”সব্বোনাশ হয়েছে গো গিন্নী!  সব্বোনাশ হয়েছে!”
বলেই বাবুই মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লো।
__”কি হয়েছে? অমন করে বসে পড়লে কেন?”
__”এইমাত্র শুনে এলাম ওই বাংলোর মালিকটা একটা লোককে এইদিকে হাত দেখিয়ে বলল ‘কেটে ফ্যাল,একেবারে গোড়া সমেত’….হ্যাঁ গো মালকিনের নাকি শখ এখানে ঠাকুরঘর দাঁড় করাবে…..”।
বাবুইয়ের গিন্নী আঁতকে উঠে__
__”মানে? তুমি ঠিক শুনেছ?”
__”শুনেছি আবার দেখেওছি গো! যে লোকটাকে কথাগুলো বলল তার হাতে ধারালো একটা অস্ত্রও আছে….সব শেষ হয়ে গেল গো গিন্নী….. আমাদের সব শেষ হয়ে গেল!”

বাবুই হাউহাউ করে কেঁদে উঠলো। গিন্নীর চোখেমুখেও আতঙ্কের ছাপ।বুকের কাছ ঘেষে ঘুমিয়ে থাকা বাচ্চা দুটোকে সে আরেকটু কাছে টেনে নিল।এমন সুখের সংসার এইভাবে ভেসে যাবে ভেবে তার দু চোখ বেয়ে জলের ধারা নেমে এলো।
__”এখন কি হবে গো?…এইদুটো কচি বাচ্চাকে নিয়ে আমরা কোথায় দাঁড়াবো গো?….এমন অন্যায় কেউ কি করে করতে পারে? এইটে তো আমাদের “ভিটেমাটি”, এইভাবে আমাদের তাড়িয়ে দেবে?”

ঠিক তখনি নীচ থেকে একটা শনশন শব্দ উঠে আসে।খুব ধারালো কিছু একটা দিয়ে শক্ত গুঁড়ি কাটলে যেমন শব্দ হয়।কর্তা গিন্নী দুজনেই শিউরে ওঠে।পায়ের তলার মাটি কাঁপতে থাকে।বাবুই আরেকবার হাউহাউ করে কেঁদে ওঠে।গিন্নী তখন বুক চাপড়াতে চাপড়াতে বলে__
__”ধর্মে সইবে না! এ পাপ ধর্মে সইবে না!….এর বিচার হবেই হবে….মা প্রকৃতি ক্ষমা করবেন না…..নরকে যাবি তোরা, তোদের কর্মের ফল ভোগ করেই যেতে হবে”।
মস্ত বড় গাছটা মড়মড় শব্দ করে কাত হতে শুরু করলো। বাবুই আর তার গিন্নী তখন কোনরকমে বাচ্চাদুটোকে কাঁচা ঘুম থেকে তুলে, সহায় সম্বল সব ফেলে উড়ে গেল….অজানা দেশে,অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে।

                       (২)

সময়ের ভারে ক্লান্ত শ্রান্ত জরাজীর্ণ বাড়িটা তার চারপাশের, আধুনিকতার মোড়কে ঢাকা, জনবসতির মাঝে ভীষণরকম অসামঞ্জস্য নিয়ে কোনরকমে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।আশেপাশে যেখানে একটার পর একটা চলমান সিঁড়িযুক্ত বহুতল আকাশ ছোঁওয়ার স্পর্ধা দেখাচ্ছে সেখানে এই বাড়িটা খালি তার বিশাল ব্যাপ্তি সমেত “প্রোমটার রাজের” লোলুপ দৃষ্টিকে উস্কে দিচ্ছে।

সদর দরজায় সজোরে আঘাত পড়লো।দরজা খুলতেই বাড়ির মালিক এলাকার কালু মস্তানের মুখোমুখি।এই কালু হচ্ছে বিজয় মেহেতার ডানহাত।বিজয় মেহেতা হল এখানকার নামজাদা প্রোমটার, স্থানীয় নেতার হাত আছে যার মাথার উপর।
__”এক মাস সময় পাচ্ছিস ঘর খালি করার, আর তার বদলে তোর এ্যাকাউন্টে বিশ লাখ ফেলে দেওয়া হবে…..এক মাসের মধ্যে বউবাচ্চা নিয়ে চুপচাপ কেটে পড়বি…..আর যদি হুঁশিয়ারি করেছিস তো জেনে রাখ এখানে গঙ্গা বইবে,রক্ত গঙ্গা…..”।

কথাগুলো শেষ করে একটা নমস্কার ঠুকে কালু মস্তান চলে গেল।মালিক কাঁপতে কাঁপতে দোরগোড়ায় ধপ করে বসে পড়লো।ভিতর থেকে মালিকের গিন্নী ডুকরে কেঁদে উঠলো।
___”এই সর্বনাশটাই আঁচ করেছিলাম গো….এখন কি হবে?….কোথায় যাবো আমরা, এতদিনকার ভিটেমাটি ছেড়ে?…..এইভাবে কেউ কি করে পারে গো আমাদের উৎখাত করতে?”।
বাড়ির মালিক বাক্যহীন।অসহায়ের মত মাটির দিকে চেয়ে।গিন্নী বুক চাপড়ে বলতে থাকলো__
___”সইবে না, এ অবিচার ধর্মে সইবে না….তোরা সব নরকে যাবি রে! ঈশ্বর ক্ষমা করবেন না…..পাপের ফল ভোগ করতে হবে তোদের….করতেই হবে”।

গিন্নীর আর্তনাদ বাড়ির ঠিক পাশটাতেই একসময়ের মস্ত বড় গাছটা কেটে মার্বেল পাথর দিয়ে যে ঠাকুর মন্দিরটা তৈরি করা হয়েছে তাতে ধাক্কা খেলো,ধাক্কা খেয়ে ফিরেও এলো।

বিভাগ:দীর্ঘসূত্র

উচ্চারণ ওয়েব ম্যাগাজিন

কথাদের স্পর্ধা

১ টি মন্তব্য

  1. প্রকৃতি ও মানবসভ্যতার একটি মূলগত দ্বন্দ্ব অন্যবদ্য ভাবে উঠে এসেছে গল্পটিতে। বস্তুত প্রাকৃতিক নিয়ম ও সম্পদকে তথাকথিত “মানুষের ভাল”, (যাকে আজকাল “উন্নয়ন” বলা হয় রাজনৈতিক ভাষ্যে) র জন্য ব্যবহার
    করার নামে কিছু মানুষের ঝুলিতে কুক্ষিগত করতে, ঈশ্বরবাদ ও ধর্ম চিরন্তন একটি হাতিয়ার। তবে প্রাণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য অভিযোজন। এই গল্পের পাঠক হিসেবে আশা করব কোন এক দিন বাবুইপাখিও অভিযোজিত হয়ে মানুষের প্রতিস্পর্ধী হয়ে উঠে নিজের বাসা বাঁচাতে সক্ষম হবে।

    Like

Arijit Kumar শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s