আমার লেনিন

দেবরুপ সরকার

সুখিয়াপোখ্রি থেকে ৭ কিলোমিটারের একটা ট্রেকরুট ওপরে নীল আকাশ ও দুধারে ঘনসন্নিবিষ্ট সবুজ ফেলে চলে গ্যাছে মানেভঞ্জনের দিকে। সেখান থেকে ধোতরে ও রিম্বিক হয়ে শ্রীখোলা। এই রাস্তাটায় পুরোনো ব্রিটিশ ল্যান্ডরোভারগুলো বেশ সুলভ। কিন্তু সরু পাহাড়ী নদীগুলোর তালে পা মিলিয়ে ট্রেক করে এগোনোর বেশ রোমাঞ্চ আছে। শ্রীখোলা থেকে আর চার চাকার কোনো উপায় নেই। সেখান থেকে গুরুদুম হয়ে মোট ১৬ কিলোমিটার ট্রেকের পরেই সান্দাকফুর নিস্তব্ধ নির্জন ২২হাজার ফুটের নৈস্বর্গিক মেহন। অর্ণব আর আগ্রহ ধরে রাখতে পারে না কোনোমতেই। তার ভীষণ ক্লান্ত বোধ হয়। একজোড়া অনুসন্ধিৎসার অক্ষিকোটরের জমাট ফোকাস থেকে সে সজোরে সরিয়ে রাখে লোকাল ট্রাভেল-গাইডটা। নিত্যতার যে নিরবিচ্ছিন্ন অবসন্নতা—তার পেট ফুঁরে হররোজ পালানোর যে পরিকল্পনা, পরিকল্পনাই যে সাময়িক শিহরণ তোলে অর্ণবের প্রতিটা লোমকূপে—সেগুলোও বেশ ক্লিশে হয়ে আসে। দৈহিক ক্লান্তি সহজেই মাথার স্ফূর্তির কাছে দমিয়ে নিতে শিখেছি আমরা সকলেই। কিন্তু অর্ণবের ক্লান্তি তার মনের— তার প্রতিটা শিরা উপশিরা রক্ত মজ্জা য্যানো থিতিয়ে এসেছে। অর্ণবের নিজেকে বেশ ভারী মনে হয়। সে ঘরের লাল নাইটল্যাম্পটা জ্বেলে ফ্রিজ থেকে একটা ঠাণ্ডা জলের বোতল ও কাঁচের আলমারিটা থেকে একটা গ্লাস নামিয়ে আনে টেবিলে। ব্যাগের চেনটা সড়াৎ করে খুলে বের করে সদ্য কিনে আনা বাংলার বোতলটা। এক অপার্থিব নিঃসঙ্গতা ছেয়ে আছে গোটা ঘরটার প্রতিটা বর্গফুটে। অর্ণবের মনে পড়ে ওর বাবা বেঁচে থাকতে এই লাল আলোটা জ্বেলেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতেন আর সামনে ফেলে রাখতেন লাল-ইস্তেহার। ফরাসী বিপ্লব ভিয়েতনাম নকশালবাড়ি দাস ক্যাপিটাল এঙ্গেলস লেনিন আর ফুটপাথ থেকে কুড়িয়ে আনা হাজার হাজার চটি বই। আর তিনি রোজ হাজিরা দিতে যেতেন পাড়ার পার্টি অফিসে। পার্টি অফিসটার গরম ঘুপচি ঘরটায় প্রায়ই তিনি বসে থাকতেন একাই, নির্বাক, নিশ্চুপ, কখনোবা আরো দু-একজন বৃদ্ধ, তারাও নিথর, অনেকটা হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের সাক্ষ্য বয়ে বেড়ানো নিষ্প্রাণ মূর্তির মতো। অধুনান্তিক এ ডিজিটালাইজেশনের কিছুই বুঝতেন না ওর বাবা, মাটিতে খেতে বসতেন বাবু হয়ে, জানতেন না স্মার্ট ফোন বা ডেবিট কার্ডের ব্যবহার, তবে তিনি জানতেন, বিশ্বাস করতেন, একদিন কেউ একবেলা একমুঠো খেয়ে বাঁচলে পৃথিবীর সক্কলে একমুঠোই তুলে নেবে মুখে, একদিন কারোর অনেক থাকলে, সকলের সেই অনেকে থাকার সমানাধিকার। অর্ণব রাজনীতির কিছুই বোঝেনা, রাজনীতি মানেই ভোটের সময় পাড়ায় বোম পড়লে ভয়ে সিঁটিয়ে থাকা। তার সবসময় মনে হতো কেউ বা কারা এক্ষুনি তাদের বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে তার বাবাকে আক্রমণ করতে। এই বুঝি কেউ দরজা ঠেলবে! অর্ণব ডান-বাম মতাদর্শের বিভেদ বুঝতে চায়নি কখনো, সে কেবল জানে প্রাথমিক জ্ঞান, আদর্শ, বিশ্বাসের রাজনীতি থেকে সরে এসে আধুনিক এই সময়বীক্ষায় সকলেই মত্ত ক্ষমতার আগ্রাসনে। অর্ণব কেবল জানে ‘মাওবাদ’ কোনো টেররিজম্‌ বা অ্যান্টি সোশ্যালিজমের সমার্থক নয়, মাওবাদ একটা আদর্শ। অর্ণব এখন বোঝে ওর ঘরের এই পাতলা লাল আলোটার একটা সম্মোহন আছে। এইসবই ভাবতে থাকে সে, ভাবতে ভাবতে গ্লাসে মেপে নেয় মদ ও জলের সুষম অনুপাত। টেবিলের উল্টোদিকে একটা চেয়ার সরার আওয়াজে অর্ণব চোখ তোলে। চেয়ে দ্যাখে এক উচ্চদেহী কোট-প্যান্ট পড়া লোক দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। পাতলা চুলের টাকমাথা লোকটা ঘন গোঁফ ও থুতনির কাছে অল্প দাঁড়ির মাঝে এক অদ্ভূত মায়াবী হাসি ধরে রেখেছে ঠোঁটে। তীব্র আকস্মিকতায় অর্ণব কিছুই বলতে পারে না। কিয়ৎক্ষন সটান চেয়ে থেকে সেই লোকটাই বলে ওঠেন-

— আরেকটা গ্লাস নিয়ে এসো। মদ খাবো।

বিবর্ণ রোজনামচায় এই ঘৃণ্য একাকীত্বেই ক্রমশ বুঁদ হয়ে থাকা অর্ণব অনভিপ্রেত সেই ব্যক্তির উপস্থিতি মেনে নিতে পারে না।

— আরে অদ্ভুত! আপনি ঢুকে এলেন কী করে আমার বাড়িতে? কে আপনি?

লোকটি সেই অমলিন হাসি চেপে রেখেই বলেন,

— শুধু বাড়ি বলছো? মাথার প্রতিটা নিউরোনে সেঁধিয়ে যেতেই তো এসেছিলাম। আমিই তো বলেছিলাম, ‘Give me four years to teach the children’ আমাকে চার বছরের জন্য তোমার বাচ্চাদের শিখিয়ে নিতে দাও। আর আমি ওদের ভিতরে যে বীজটা পুঁতে দেবো তা আর কখনো উপড়ে ফেলা যাবে না। পেরেওছিলাম। সোভিয়েত পেরেছিল। কিন্তু সেটা টেকেনি। এটাই তো নিয়ম।

— আরে কে আপনি?

হতভম্ব অর্ণব ছিটকে সরে আসে চেয়ার থেকে। এক অদ্ভুত ভয় তাকে ঘিরে ধরেছে। তার বারবারই মনে হচ্ছে ঐ লোক গুলোই এসে গ্যাছে দরজা ভেদ করে…

— তুমি আমাকে চিনতে পারছো না, এটা কিন্তু আমার কাছে বেশ অসম্মানের। তোমার বাবার বই গুলোর প্রচ্ছদে দ্যাখোনি? ভ্লাদিমির লেনিন।

— খিল্লি করছেন?

অর্ণব স্তিমিত হয়ে প্রশ্ন করে। তবে নতজানু সে। প্রকৃতই তো হুবহু এক চেহারা! ওর আবসার্ড মনে হয়, মনে হয় পাগল হয়ে যাচ্ছে সে।

— অ্যাবসার্ড? সামানেই বিজেপি ক্ষমতায় আসছে। সেটাও বামেদের ভোট কোট। লেলিনের আচমকা প্রকটস্থ হওয়া এর থেকেও অ্যাবসার্ড? ঢালো ঢালো মদ ঢালো। শ্রেণী শত্রুর নাম ম্যানহোল খুলে মানুষ মেরেছে কংগ্রেস। নকশালরাও একই ভাবে। ওরাই এখন গলাগলি করে ভোট বুঝছে। অ্যাবসার্ডটিরতো ঢের দেখছ বাবা! একটু মদ খাওয়াও তো দেখি!

অর্নব মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে থাকে কেবল। তার হাত সরে না। লেনিন বলে ওঠেন,

— এবার কি ‘one man with a gun can contol 100 without one’ গোছের কয়েকটা বাতেলা ঝারলে বিশ্বাস করবে?

অর্নব সম্বিতে আস। সে আর একটা গ্লাস নামিয়ে এনে মদ ঢালতে ঢালতে বলে,

— এটা কিন্তু বাংলা! লেনিন মৃদু হেসে উত্তর দেন,

— এটা খেলে কি বাঙালী নেশা হবে?

অর্নব মদ মিশিয়ে গ্লাসটা এগিয়ে দেয় লেনিনের দিকে। নিজেও তুলে ন্যায় হাতে। লেনিন বেশ কিছুটা মদ একসাথে গলায় ঢেলে বললেন,

— যখন স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা শুরু হল, সটান ভাগ হয়ে গ্যালো বুর্জোয়া বিলাস-ব্যাসন আর প্রলেতারিয়েতদের ক্রাইসিস, তখন ভোগের একটা প্রধান উপকরণ ছিল মদ। আবার প্রলেতারিয়েতদের নেশাটুকুই তো! নেশা ছাড়া আর কীই বা আছে। দ্যাখোনা যে দেশে যত অভাব সে দেশে মদ, গাঁজা, পাতা ততই সুলভ। অথচ মদের ফ্যাক্টরি গুলোয় যে হাজার হাজার শ্রমিক খেটে চলেছে ওই বুর্জোয়া চুতিয়াগুলোর চোখে আরাম আনার জন্য, তাদেরই এক ফোঁটা মদে হাত দেওয়ার জো নেই। যাদের পচা মদটাও জুটতো না, তারা ওই ফ্যাক্টরি গুলোর আশে পাশের নর্দমা থেকে জল তুলে খেত। গু-মুত সবই খেত। আমি খাইনি সে সব? লেনিন তো কোনো প্রপার নাউন নয়। সব শোষিতের বুকে একটা করে লেনিন ছিল। বাংলা তো অনেক ভালো মদ হে!

— কিন্তু আমি তো আপনার সাথে কথা বলতেই পারবো না। আপনার কিছুই আমি পড়িনি…

অর্ণবকে থামিয়ে লেনিন বলেন,

— আমি একসময় বলেছিলাম বটে, ‘Without a revolutionary theory there cannot be a revolutionary movement’ একটা বৈপ্লবিক তত্ত্ব ছাড়া বিপ্লব হয়না। কিন্তু তত্ত্ব তো আমার! সকলেরই তো একটা দ্যাখা আছে, বিশ্বাস আছে, মূল্যবোধ আছে। ওসব তত্ত্ব-ফত্ত্ব আর খাটে না। এখন ক্রাইসিসটাও নিজের ভেতর আর লড়াইটাও নিজের সাথেই। তত্ত্ব-ফত্ত্ব ওসব কিছু নয়। মার্ক্স-লেনিন-কমিউনিজম-সাম্যবাদ সব মিথ হয়ে গ্যাছে। বাস্তবে কোনোভাবেই আর যাকে পর্যবসিত করা যায় না। আমরা যে স্বপ্নটা দেখেছিলাম সেটা রয়ে গ্যাছে কেবল। থেকে যাবে। স্বপ্ন হিসাবেই।

অর্ণব দ্যাখে কমরেড লেনিন এক অসীম শূন্যদৃষ্টিতে চেয়ে আছেন আর ঘরের লাল আলোয় তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে অবিরাম। এবার তিনি চোখ সরালেন ও আরো কিছুটা মদ খেয়ে আবার বলতে শুরু করলেন,

— তোমাদের কমিউনিস্টরাই তো লেনিনের গলায় মার্ক্সের গলায় মালা দিয়ে জয় লেনিন বলে। ধরে চাবকাতে হয় বাঞ্চোৎগুলোকে। সব শালা ক্ষমতার দাস।

— আবার আমরা রুখে দিতে পারিনা আজকের এই ক্ষমতায়ন কে?

— দ্যাখো, একমাত্র ক্ষমতাই চিরন্তন। লোভে পাপ। কিন্তু ক্ষমতা পাপ নয়। ক্ষমতাই ধর্ম। আমি তো আগেই বললাম, ‘One man with a gun can control 100 without one’ কিন্তু হাতে বন্দুকটাতো থাকতে হবে! বন্দুকটাই ক্ষমতা।

— তাহলে তো ব্যাপারটা একই!

— না এক নয়।

হঠাৎই বেশ উত্তেজিত হয়ে ওঠেন কমরেড লেনিন, কিছুটা থেমে গলা নামিয়ে বলেন,

— ক্ষমতাটা কিভাবে ব্যবহার করছি সেটাও বিষয়। ক্ষমতা ব্যবহার করে গ্রামের পাঁজর বেরিয়ে আসা লোকগুলোকে তোমাদের বিড়লা টাটার পাশে বসিয়ে দেওয়া যায়। আবার ক্ষমতা ব্যবহার করে ওই মানুষগুলোকেই স্রেফ বুলডোজ করে দেওয়া যায়। দর্শনটা ফ্যাক্টর। আদর্শটা ফ্যাক্টর। এখানে ক্ষমতার নামে ফ্যাসিজম চলছে।

— এখানেও তো ক্রাইসিস আছে। এত অভাব, এত কিছু। এই শোষিত মানুষগুলো রুখে দাঁড়াচ্ছে না কেন? আবার কেন একটা বিপ্লবের প্রেক্ষাপট তৈরী হচ্ছেনা?

— মধ্যপন্থায় বিপ্লব হয় না ভাই। বিপ্লব সেখানেই সম্ভব যেখানে বুর্জোয়া আর প্রলেতারিয়েত মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে—মধ্যপন্থার কোনো জায়গা নেই। আর এখানে উচ্চবিত্ত আর নিম্নবিত্তের মাঝে মধ্যবিত্তের একটা হিউজ ব্রীজ। যে দেশে মধ্যবিত্ত বেশি তাদের কিস্‌সু হবেনা। কারণ এই শ্রেনীটা ডেনজারাস্‌, মেরুদন্ডহীন। বুর্জোয়া আর প্রলেতারিয়েত—এরা উভয়ই সৎ, অন্তত আল্টিমেট অভীপ্সার দিক থেকে—এক দল চায় ক্ষমতা, পুঁজি নিজের হাতে রেখে দিতে আর এক দল নিজের অধিকার বুঝে নিতে চায়। আর মাঝের এই মধ্যবিত্ত হল ঢ্যামনা, সুবিধেবাদী। এদের কোনো চরিত্র থাকেনা।

এরপরই দুজনেই চুমুক ফ্যালে মদের গ্লাসে। অর্ণব একটা বিড়ি ধরায় আর একটা সিগারেট বাড়িয়ে দেয় লেনিনের দিকে। অনেকক্ষণ দুজনেই নিশ্চুপ। লেনিন সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলেন,

— আর বিপ্লবটা করবে কে? কৃষক শ্রমিকদের তাদের অধিকার বুঝে নেওয়ার স্বপ্নটা দ্যাখাবে কে? এখানকার যারা নিজেদের কমিউনিস্ট বলে আলিমুদ্দিন দখল করে রেখেছে ওরা তো নিজেরাই পেটি বুর্জোয়া। ভারতের কমিউনিজমের কোনো চরিত্র নেই।

— কেনই বা কোনো চরিত্র তৈরি হলো না? এখানেই বা কেন একটা মার্ক্স একটা লেনিন একটা চে তৈরি হলো না?

— কে বলেছে হয় নি? কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে মার্ক্স লেনিন চে হয়নি। আর তোমরা ছুটেছ এই নাম গুলোর পেছনেই। তোমাদের নিজেদের কিছুই তোমরা আমল দাওনি। রামকৃষ্ণ বলছেন, যে চারজন আলাদা শ্রেণীর মানুষ, আলাদা জাত-ধর্মের মানুষ এক রাতে হাতে চারটে আলাদা পাত্রে জল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সকলের পাত্রেই একটা চাঁদের প্রতিবিম্ব তৈরী হচ্ছে। এটাই তো সাম্যবাদ। আমরা কি আলাদা কিছু বলছি। তোমরা নিজেদের কোনো দর্শনই তৈরী করে উঠতে পারোনি কখনো।

এবার লেনিন সিগারেটে আরেকটা লম্বা টান দেন ও অর্ণবকে বলেন ফাঁকা গ্লাসে কিছুটা নিট মদ ঢেলে দিতে। অর্ণব ঢেলে দিলে সেটা একেবারে গলায় চালান করে বলেন,

— তোমাদের প্রথমে তৈরী হল CPI, কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া। তারপর সেখান থেকে একদল রাশিয়ান নীতি মেনে নিলেন। তৈরী হল CPIM, কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া মার্ক্সিস্ট। এবার একদল চিনের মতাদর্শে ঝুঁকলো। ক্রমাগতই ভাঙছে জুড়ছে… CPIML তৈরী হল – কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া মার্ক্সিস্ট লেনিনিস্ট। নিজেদের মধ্যেই এত দ্বন্দ্ব থাকলে বিপ্লব হবে কীভাবে? তোমরা রাশিয়ার পেছনে ছুটছো, চিনের পেছনে ছুটছো আর তোমাদের দেশেই বুদ্ধর মতো এতো র‍্যাডিকাল একটা লোক, তার কথা বোঝার চেষ্টা করছো না।

— কিন্তু যারা বামপন্থী রাজনীতি করছে, তারা তো বদলটা চেয়েছিলই।

— বাল চেয়েছে। বললাম তো এরা সব তিলে খচ্চর আর পেটি বুর্জোয়া। তেভাগার সময় এরাই ছাত্রদের বলল যে উচ্চশিক্ষার চেয়েও মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোটা জরুরী। আর এই তরুণ প্রাণগুলো যখন সত্যিই নিজেদের সবটুকু ঢেলে গ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়লো, তখন তোমাদের এই কমরেডরাই আটকে দিল তাদের, মেয়েদের বললো—‘Go back to the kitchen’ সরোজ দত্ত ভ্যানিস হয়ে গেল। তারপর ক্ষমতার এসে কি করলেন জ্যোতি বসু? বিপ্লব করলে, সত্য বেরিয়ে এলে যদি গদি খসে যায়। কিষেনজী বরং সৎ। মানুষের পাশে থেকেছে, অনেক খেটেছে। মমতা, মোদীর চরিত্র নিয়ে তো কোনো দ্বিধাই নেই। ফলতঃ কাজ হাসিল হলে কিশানজী টেররিস্ট হয়ে যাবেন, অ্যালুপ হয় যাবেন, এ আর আশ্চর্য কী? কিন্তু তখন কী বালটা ছিড়ছিল তোমাদের আলিমুদ্দিন? কোথায় গেল রেভোলিউশন?

— কিন্তু বিপ্লবটাতো প্রয়োজন।

— তুমি এতো বিপ্লবের পেছনে পরে আছো কেন বলতো? মদ ঢালো আরো। বিপ্লব টিপ্লব আর সম্ভব নয়। এখন মানুষ চে, মার্ক্স, লেনিন টি-শার্টে পড়ে ঘুরে বেড়ায়।

এরপর দুজনেই আবার চুপচাপ। মদ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। অর্ণব শেষ পেগটা বানায়। লেনিন পকেট থেকে দুটো বাদামী চুরুট বার করে ধরায়। একটা এগিয়ে দেয় অর্ণবের দিকে। অর্ণব মদ বানিয়ে লেনিনের দিকে একটা গ্লাস ধরে বলে,

— আপনি জানেন কয়েকদিন আগে ত্রিপুরায় আপনার মূর্তি ভাঙা হয়েছে।

লেনিন খুব শান্তভাবে বলেন,

— বেশ করেছে। আর এতো নতুন নয়, ইউক্রেনে হয়েছে, লিথুয়ানিয়ায় হয়েছে, ঘানায় হয়েছে। বিদ্যাসাগর, নেহেরু, শ্যামাপ্রসাদের মূর্তি হয়। লেনিনের মূর্তি হয় না, মার্ক্সের মূর্তি হয় না। লেনিন একটা আদর্শের নাম, বিশ্বাসের নাম। যে বস্তুবাদ নিয়ে আমাদের এত বক্তব্য তার পরেও কমিউনিস্টরাই লেনিনের মূর্তি বানায়, গলায় মালা ঝুলিয়ে হাত মুঠো করে ছুঁড়ে দ্যায় শূণ্যে, লাল সেলাম বলে! এই শুয়োরের বাচ্চাদের গুলি করতে ইচ্ছে করে। ইতিহাস রাজার। রাজার মূর্তি বসে। রাজার মূর্তি বসে শ্রমিক দের পাঁজরের ওপর। লেনিন কোনো রাজা নয়। যেখানে আমরা সাম্যবাদের স্বপ্ন দেখেছি, সেখানে লেনিনের মূর্তি তোমার আদর্শ, বিশ্বাসে তৈরি হোক, কংক্রীটের একটা নিষ্প্রাণ মূর্তির মেকি হায়ারার্কিতে নয়। যে শালা ভেঙেছে আমার মূর্তিটা সেই সাচ্চা কমিউনিস্ট। সে চায়নি আমি স্রেফ একটা নিষ্প্রাণ মূর্তি হয়ে থেকে যাবো আর মূর্তিটার নিষ্প্রাণ চোখ দিয়ে দেখে যাবো এই ফ্যাসিস্টদের বর্বরতা। চলো কমরেড উঠে পড়ি। তোমাদের ময়দানেও আমার একটা মূর্তি আছে না! চলো আজই নামিয়ে ফেলি। বিশ্বাস করো কমরেড, এটাই বিপ্লব! তুমি যদি মূর্তিটা ভাঙো, আমার মাথাটা মিশিয়ে দাও রাস্তায়, যেখানে প্রতিদিন প্রতিমূহুর্তে হাজার হাজার মানুষের মাথা মিশে যাচ্ছে অনায়াসেই, তবেই বুঝবে আমাদের স্বপ্ন সার্থক, আমাদের আদর্শ সার্থক। তোমার শহরের রাস্তায় দ্যাখো, লক্ষ লক্ষ মানুষ মুরগির পা, নাড়ি-ভুড়ি খেয়ে বেঁচে আছে, ঠান্ডায় গরমে পড়ে আছে এই রাস্তাতেই, সেখানে আমি সামান্য একটা মূর্তির ছদ্মবেশে হায়ারার্কি হয়ে থেকে যেতে পারবো না। চলো কমরেড, এটাই সঠিক সময়।

অর্নব উঠে পড়ে। ড্রয়ার টেনে একটা লম্বা হাতুড়ি আর একটা জং ধরা ছেনি নিয়ে নেমে পড়ে প্রেতায়ত শহরের রাস্তায়। সাথে কমরেড লেনিন। তার সারা শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ, রোমাঞ্চ খেলে যায়। তার নিজের বেশ হালকা মনে হয়। জ্বলজ্বল করছে তার দুটো চোখ। এক অদম্য গণঅভ্যুত্থানের কল্পবাসন য্যানো এক লহমায় মিটিয়ে দিয়েছে তার যাবতীয়, ক্লান্তি, মানসিক দ্বিধা, দীর্ণতা, হাতুড়ি আর ছেনি হাতে তার নিজেকে শ্রমিক মনে হয়, মনে হয় এই বীরভোগ্যা বসুন্ধরার চিরায়ত প্রলেতারিয়েতদেরই প্রতিনিধি সে। অর্ণব ও লেনিন ময়দানে লেনিনের নিকষ কালো মূর্তিটার সামনে এসে থামে। অর্ণব আরো শক্ত করে দুহাতে চেপে ধরে হাতুড়ি ও ছেনি। লেনিন আরেকটা চুরুট ধরান। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলেন,

— আমার কাজ শেষ কমরেড। আমায় এবার ফিরতে হবে। বাকীটা তোমার কাজ।

ভোর হচ্ছে। একটা গোটারাতের হাইবারনেশন থেকে গা ঝাড়া দিয়ে ধীরে ধীরে বেড়িয়ে আসছে আমার শহর। অর্ণব এগিয়ে যায় মূর্তিটার দিকে। আর শুনতে পায় মিলিয়ে যেতে যেতে কমরেড লেনিন চেঁচিয়ে বলছেন,

— লাল সেলাম কমরেড! ইনকিলাব জিন্দাবাদ।…

বিভাগ:দীর্ঘসূত্র

উচ্চারণ ওয়েব ম্যাগাজিন

কথাদের স্পর্ধা

১ টি মন্তব্য

  1. অসাধারণ বললে কিছুই বলা হয় না। ক্ষমতার সাকশনে নিরন্তর ছিবড়ে হতে থাকা আমাদের পেটের কাছে বিজকুড়ি কাটা কথা গুলো বলে গেলেন লেখক দাপটে।

    Like

Arijit Kumar শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s