ধর্মঘট

অরিজিৎ কুমার ও অহনা সরকার

ম‌ইদুল নিজের হাত দুটো দেখছেন। কংক্রিটের মশলা ভর্তি টিনের ড্রাম লতিফের হাত থেকে নিয়ে এগিয়ে দিচ্ছেন শঙ্করকে। শঙ্কর থেকে পটা, পটা থেকে জঙ্গল … এভাবেই মজুরদের খাটুনি পৌঁছে যাচ্ছে কুড়িতলা আরামঘরের ছাদ গড়তে। তার‌ই ফাঁকে ম‌ইদুল দেখছেন নিজের খয়ে যাওয়া, কড়া পড়া হাতের চেটো। কাল থেকে এই হাতদুটোর ছুটি। অনেকদিন তৈরি হচ্ছেন শঙ্কর-ম‌ইদুল-জঙ্গলরা কালকের দিনটার জন্য। শুধু ওঁরাই কেন? ইঁটখোলা, জুটমিল, গ্যারেজ, বাসডিপো, চালকল, বাজারের গোডাউন, ভাতের হোটেল, মদের দোকান সব জায়গার মজুর, খাটিয়ে, মুটেরা তলে তলে কয়েকমাস তৈরি হয়েছেন কালকের জন্য। এলাকা ভাগ করে করে চাল গম আলু তেল নুন ওষুধ পথ্যি জমিয়েছেন ওঁরা গোপনে। যা জমেছে তাতে মাস‌দুই দুবেলা খাবার জুটে যাবে মজুর মহল্লার।‌ ম‌ইদুলদের ভরসা আছে তার আগেই কলমালিক, বাসমালিক, বাজারমালিকরা আর সরকার ওদের দাবি মেনে মজুরি বাড়াতে, রোগজ্বালার ওষুধপথ্যির খরচা দিতে রাজি হবে। আর না মানলে আবার নতুন কিছু ভাবতে হবে। রোগাভোগা দ্বারকেটা যেমন বলে “কলগুলো, বাসডিপো, সিনেমাহল, শপিংমলগুলো দখল করে ফরসা জামা পরা লোকগুলোকে মজদুরিতে লাগাতে হবে ঘাড় ধরে। মজুরি না বাড়াবে তো নিজেরাই গতর চালাক।” ম‌ইদুলের যদিও মন পড়ে আছে খয়ে যাওয়া হাত আর তাতে কড়াগুলোয়। ম‌ইদুল যখন আসমানীর কোলের ছেলেটাকে ধরেন, বেচারা ককিয়ে ওঠে ওনার আবলাখাবলা হাতের চোটে। হরতাল যদি লম্বা টানে রোজ হাতে একটুকু তেল মেখে নেবেন ভেবেছেন, একটু যদি নরম ….

ছিয়াশি থেকে একশ আটের দূরত্ব

নরম করে এঁটেল মাটির তালগুলো ছাঁচ মিস্তিরিকে দেন নীলিমা । সেই তাল ছাঁচে ফেলতে গিয়ে একটুকরো ডেলা পেলেই মালিককে নালিশ করে ছাঁচ মিস্তিরি। মালিকটা ধমক যত না দেয় তার চেয়ে বেশী নীলিমার মাইগুলো চোখ দিয়ে গেলে আর নাক খোঁটে। শেষমেশ মজুরি থেকে বেশ খানিকটা কেটে খাতায় লেখে আর টিপছাপ নিয়ে নেয়। এসব করে ঝুপড়িতে ফিরতে দেরি হলে আর এক মুশকিল। শঙ্করের কাজের সাইট ঝুপড়ির পাশেই। সে আগে এসে খিদের চোটে টঙ হয়ে থাকবে আর খিস্তির ফোয়ারা ছোটাবে, নীলিমার ওপর হাত চালাবে আনতাবড়ি। কাল থেকে নীলিমার‌ও হাড় জুড়োবে হরতালের কদিন। মালিক হয়ত মজুরি বাড়াবে হরতালের পর। রফিক আলিও নীলিমার মত মাটি মাখা, বাছা, দলার কাজ করে। ও পায় দিনে একশ আট আর নীলিমা ছিয়াশি। যদি বা সেটা সমান হয় আর বাড়েও, ঘরের মালিকের মারের হাত থেকে রক্ষা কি পাবে?

ছোটোলোকের গুষ্টি

পাবে বসে আরেকটা বিয়ার জাগ অর্ডার করল কলেজ ছাত্রছাত্রীদের দলটা। অঙ্কিত নামে ছেলেটি এই দলের পান্ডা, কারণ ওর হাতেই সবসময় আর সবচেয়ে বেশী টাকা। ওর বাপের রিয়েল এস্টেটের জমাট ব্যবসা সঙ্গে ছটা ইঁটভাটার মালিক কলকাতার কাছে রসুলপুরে। সেই ব্যবসার মুনাফা দুহাজার কিলোমিটার দুরের এই বোম্বের পাব-বার- রেভ পার্টিগুলোতে ঝনঝন করে অঙ্কিতের হাত দিয়ে। দলের‌ই একজন হঠাৎ দেখালো খানিকদুরে জায়ান্ট স্ক্রিনটায় ব্রেকিং নিউজ স্ক্রল করছে- “আন-এ্যানাউন্সড, ইনডেফিনিট স্ট্রাইক অব ওয়ার্কারস অল ওভার ইন্ডিয়া, গোয়িং টু হিট অল ওভার দ্য কান্ট্রি।”

কয়েকজন হেসে উঠল দলটার। অঙ্কিত চোখ সরিয়ে নিল! শালা ছোটলোকের দল! বাকিদের দিকে চোখ বোলাতে বোলাতে বলল “দে উইল গিভ আপ ইন আ ডে, দোজ জার্কস ডোন্ট ইভেন গেট ওয়েজ টু সারভাইভ আ ডে .. আর বলে কিনা ইনডেফিনিট .. শালা ছোটলোকের গুষ্টি”। দলের‌ই একটি মেয়ে বলে উঠল “ডোন্ট ফরগেট অঙ্কিত, এই যে পাবে বসে মাল খেয়ে খিল্লি করছিস সেটাও অন দোজ সো কলড ছোটোলোকের গুষ্টির রক্ত জল করা পরিশ্রমের প্রোডাকশন বেচে। এ্যান্ড এটাও জেনে রাখ, ওরা হাল ছাড়বে না, অন্তত দুমাসের খাবার ওষুধ আর জল জমিয়েছে ওরা।” দলের কয়েকজন হো হো করে হেসে উঠল। মেয়েটি উঠে যেতে যেতে বলল “গেট রেডি টু জার্ক ইওর ব্লাডি ডিক অঙ্কিত এবার থেকে”।

খবর, অথবা খবর

থেকে থেকেই নিউজ আপডেট আসছে তৃষার ডেস্কে। কিন্তু সব সিস্টেম ইউপিএসে চলায় কোনো স্টোরি ফাইলাল করা যাচ্ছে না। সার্ভারের অবস্থাও মর মর। অথচ আপডেট গুলো সবকটাই ব্রেকিং হতে পারে। অবশ্য দেখবে কে সে খবর! গোটা দেশে কোনো পাওয়ার প্ল্যান্ট চলছে না। একটাও নিউজপেপার বিলি হয়নি। বেশিরভাগ কারখানা বন্ধ। যাদের নিজস্ব পাওয়ার প্ল্যান্ট আছে তাদের অফিসাররা চালু রেখেছে শোনা যাচ্ছে। সেই বা কতক্ষণ! রেল বন্ধ। পিএনজির বুস্টার স্টেশন ও অফিসাররা চালাচ্ছে। আসলে সব জায়গাতেই প্রয়োজনের তুলনায় কত কম শ্রমিক দিয়ে কাজ চালানো হয় সেটা স্পষ্ট হচ্ছে। তৃষার যেসব কলিগ ফিল্ডে রয়েছে তারা ক্রমাগত নানা চ্যাট বক্সে এইসব আপডেট পাঠাচ্ছে। গ্রামীণ শিল্প ও চাষবাসের কোন আপডেট নেই। সম্ভবত নেট‌ওয়ার্ক নেই শহর এলাকার বাইরে।

এখন বাড়ি ফিরে যাওয়া ভাল ছিল। তৃষার বাবা নামকরা ডাক্তার। দিনের রোজগার দশ লাখের কমে নামে না। আজকে নির্ঘাৎ নামবে। আর রাগ দেখানো হবে তৃষার মায়ের ওপর। বেল্ট, জুতো, সব‌ই ব্যবহার করেন তৃষার বাবা।

কাল যারা শোষিত হবে

বাবারা এখানে ওখানে জড়ো হয়ে জটলা পাকানোর ফলে মজুরপাড়ার কচিকাঁচাদের আজ খেলার জায়গা কম পড়ে গেছে। ফলে নতুন জায়গা খুঁজতে খুঁজতেই খেলা চলছে। খেলতে খেলতেই ছেলেমেয়ের দল ম‌ইদুলের ঝুপড়ির পেছনে গিয়ে পড়ে দেখল তাদের মা-দিদিরা প্রায় সবাই সেখানে। পুরোনো কাগজের ওপর কালো রঙে লিখে কিসব বানাচ্ছেন কয়েকজন। অন্যরা দেখছেন দাঁড়িয়ে। ওদের দেখে কেউ কিছু বললেন না। অন্যদিন নির্ঘাৎ কয়েকজন পিটুনি খেত। আজ তার বদলে দেখল স্কুলের দুজন দিদি ওদের থামতে বললেন। “শোন, তোরা স্কুলে আসবি দুপুরে খাওয়ার সময়। যে যে চান করবি না, তাদের স্কুলেই পাইপ দিয়ে চান করানো হবে।” এইশুনে সবাই ছুটল কলতলা আর পুকুরঘাটের দিকে।

স্লোগান

টিভির স্ক্রিনে তাকিয়ে অঙ্কিত ঘাবড়ে গেল। রসুলপুরের ইঁটভাটা বন্ধ। সেটা খবর নয়। টিভিতে দেখাচ্ছেও না। কিন্তু বন্ধ ইটভাটা আর কনস্ট্রাকশন সাইটের মজুরপাড়ায় কিম্ভুত দৃশ্য। ঝুপড়ির দরজায় পোস্টার পড়েছে “ইজ্জত চাই, এক কাজে এক মজুরি চাই, ঘরের কাজে মজুরি চাই।” “আগে দাবি মানতে হবে, তারপর হাঁড়ি চড়াবো, কাপড় খুলবো।” পাড়ার মহিলারা পোস্টার নিয়ে পাড়া ঘুরছেন। আর তাদের সঙ্গে জনাকয়েক বাইরের মহিলাও আছেন। অঙ্কিতের ঘাবড়ে যাওয়ার কারণ এনাদের দুজন। একজন অদিতি সেন, অঙ্কিতের মা। অন্যজন সায়নী। এইজন্যেই সায়নীর কাছে এত খবর ছিল আর এত গলাবাজি করছিল পরশু পাবে। কখন ফ্লাইট ধরেছে কলকাতার কে জানে! মালগুলোর খুব তেল হয়েছে। মা আজ যা কেলানি খাবে বাবার হাতে না!

ভদ্দরলোকের ছোটোলোকামি

হাতে অনেকগুলো আপডেট। ছবি।‌ কিছু ভিডিও ও। রসুলপুর থেকে শুরু হয়ে আর‌ও অনেক জায়গায় ছড়িয়েছে ঘরে হরতাল। ‌পুরুষদের হতবাক আর দিশেহারা ভাবসাব‌ও রসুলপুর থেকে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। ‌কিন্তু তৃষা মন দিয়ে গুছিয়ে নিতে পারছে না স্টোরিগুলো। বাড়িতে কি পরিস্থিতি জানে না! কোনো খবর পায়নি বলেই চিন্তা হচ্ছে। জাফর রিজভির আপডেট ঢুকলো এই। আরে এ তো তৃষাদের কমপ্লেক্সের খবর! “মর্যাদা, সমানাধিকার, ঘরকন্নার সাম্মানিক” পোস্টার নিয়ে ধর্ণায় ওদের গোটা আবাসনের মহিলারা। ওই তো মা! বুকে ঝুলিয়েছে “গায়ে হাত তোলা বন্ধ কর”। এখন তৃষা নিশ্চিন্তে নিচে নেমে যোগ দেবে এক ই কাজে এক‌ স্যালারির দাবি তে।

তারপর …..

ছায়া পড়েছে বালতির। না এটা বলবো বলে লেখাটা শুরু করা নয়। একটা গল্প লিখতে ইচ্ছে করছে, হুঁ! তুমি যেখানে শেষ করেছো যদি তার পরে র, একদম পর লাইন থেকে ই তৃষা বাড়ি ফিরে দেখলো
আমাকে মেরে ঝুলিয়ে রাখা। হ্যাঁ আমি যে এই গল্পের পাঠক। কিন্তু কেন? কেন? খুব জরুরী প্রশ্ন অন্তত এখানে। মানুষকে মারার দার্শনিক বিচার ……. একটা পাখি খুব বিচ্ছিরি শব্দে ডাকছে! এখানে প্রশ্ন জরুরী কেন আমাকে মারা হল? আমি ই কেন মারলাম?গোয়েন্দা না থ্রিলার! কোনটা? থ্রিলারে র বাংলা কি? দেওয়াল, সিলিং ঘুরন্ত পাখা! কোথাও পেলাম না তাকিয়ে ………….ঘাড়ও চুলকালাম কিছুটা!   আমাকে মেরে ঝোলানো এটা সত্যি। পরের প্রশ্ন তৃষা কি করবে? সে তো বাড়ি ফেরার জন্য নিউজ স্কোল ও কি জানবে! বুঝতে পারছে গল্পে র ঠিক শেষ লাইনের পর গল্পে আমি ঢুকে পড়েছি। আমার ঝুলন্ত মৃতদেহ! কনফিউজড।
……. অতল তার চোখে র
“হৃদি ভেসে যায় অলকানন্দা জলে”। বরং কিছু ছড়ানো যাক। চাটাই,  মাটির বারান্দা জনা কয়েক ওরা ও মাটি বোনে। ছাঁচে নরম আগুন গলিয়ে, শহরের বড় বড় কান্ডে তারপর সেসব। যেমন আমার ই সামনে রাখা গ্লাসটপ ডেক্সে  মাটি র একটা কাটুম।
ওরা নিজেদে র কাজ বন্ধ করেনি। কাজে গেছে, ফাঁকে রুটি র টুকরো পেঁয়াজ কামড় আর সিদ্ধ কলমি ডাঁটা। আবার বাড়ি এসেছে। সমস্যাটা এখানে অন্য, গল্পে র সেটা। মালিক ওদের মজুরি কেটেছে, কারণ? নেই। এই যে আমি ঝুলন্ত মেরে ঝোলানো, তার কি কোনো কারণ আছে?

জটিল হয়ে যাচ্ছে জানি। আসলে গোয়েন্দা গল্প লিখতে বসলেই, মাথা র মধ্যে, দুজন মানুষ, তাদে র দু পা একে অন্যে ঠেকেছে টেবিলে র মুখোমুখি। জলে র গ্লাস, খালি বোতল। কয়েক টা চেম্বার খালি রাখা রিভলবার টাও। কে কাকে বা কার কখন সাথে কেন ও অবশ্যই ……..
জল খাওয়া যাক কয়েক ঢোঁক। ওপরের ছবিটা কি চেনা লাগল? চেনা ই অন্যে র লেখায় পড়েছিলাম, বিখ্যাত। এই ছবিটাই মাথার খোপে খোপে বা সাঁড়াশিতে পা দিয়ে আপনি একটা দাঁত তোলার চেষ্টা করছেন। একদম শেষে দেখা গেল, টব, ওটা আদতে একটা হাড় জমে পুঁতে গেছিলো ……….
“মন্দ নয়”। কারখানার বাইরে তুড়ি মারতে মারতে ওরা ফিরছে। ছেঁড়া শার্টে র
এখন ২ টো ৩৭ মিনিট দুপুর। আরাম বালিশে গা ঠেকিয়ে পাখিদে র ধ্যান, ভ্রম। গল্প অবশ্যই হলো না। কিছু মাত্র একই শব্দ নানা, রঙ বলবো না রূপ! উফ!

হাওয়ার ভিজে চুল ওপরে নেমে আসা বালি। এখানে কোথাও নেই সর্বত্রই অবশ্য। খালি পায়ে হাঁটছি। পায়ে র নিচ গরম, ঢেউয়ে র সাদা নীল জল ভেঙে ভেঙে লাল কাঁকড়া
পা মুড়ে বসে এখন, বাবু। চাদরে র রঙ নীল

বিভাগ:দীর্ঘসূত্র

উচ্চারণ ওয়েব ম্যাগাজিন

কথাদের স্পর্ধা

১ টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s