লেখা ও ললিতা

অমিতাভ প্রহরাজ

ললিতা অংশ-

যে মুহূর্ত হতে লেখাকে জীবিত বস্তু ভাবা শুরু করেছি, সেই মুহূর্ত থেকে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ অভয়ারন্য আমার কাছে নির্দ্বিধায় চলে এসেছে তার সমস্ত জংলি সহকারে। আমার যেকোন নিকটই জংলা জাতীয়, এই বোধ খুব সহজে মনের একটি মাধবী হয়ে থাকবে, এতটা আশা করা অন্যায়। মানুষ থেকে অরন্য হয়ে উঠতে সময় লাগে, একেক জনের একেক তরিকা থাকলেও কয়েকটা পদক্ষেপ একইগন্ধী থাকে সবার ক্ষেত্রে। এই সব একইগন্ধের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে আমরা শিশিরের মতো একটু একটু করে জমে থাকি একসাথে। একসাথে শিখি একেকটা গন্ধের উচ্চারন, লেখা তো শেখানোর জিনিস নয়, শিখিও না, শিখি এইসব। এইসব, গন্ধ উচ্চারন, শব্দ আস্বাদন। শিখি নেপোলিয়নের মতো একটি “লি”কার, শিখি সে যে নির্বাসিত কখনো যেন ভুলে না যাই। এইভাবে বর্ণমালা থেকে বাক্য ঘটানো শিখে যাই, যেন সেটি একটি দু পাথর ঠুকে আগুন জ্বালানো শেখা, বা ধারালো পাথর দিয়ে বরাহ শিকার।

চারদিকেই অরন্য, তার মধ্যে এই বেড়ে ওঠা বেশ লাগে। মাঝে মধ্যে হাল্কা ওয়াটার কালারের প্রশ্ন জাগে বটে, আমরাও কি অরন্য না আরন্যক ঘটনা কোনো? তবে তা থাকেনা, ওয়াটার কালার তো, উঠে যায়। আজ এখানে দাঁড়িয়ে হঠাৎ বোধ করি আমরাও কোন ব্যাতিক্রম নই, কোন আরন্যক ফারন্যক নয়, মোদ্দা কথা অরন্যে দাঁড়িয়ে গোপনে আমার মন নিজেকে ভাবতে ভালোবেসেছে টারজান বা অরন্যদেব, সেই সনাতন শ্বেতচর্ম অরন্যের রক্ষাকর্তা, ও সেই গৌরব উপভোগ। সেই সনাতন নরম জেলির মতো ক্ষমতাখন্ড আমার হাতের মধ্যে দপদপ করে কাকুতি মিনতি করছে, আর সেই সুখানুভূতি আঙুল থেকে ছড়িয়ে পড়ছে পায়ের মৃত কড়াটিতেও।
এই লেখাটি লেখার কথা বহুদিন আগে, এতটা দেরী হলো কারন এই প্রসঙ্গজন্তুটি বেশ খানিকটা জান্তব পটভূমিকা দাবী করছিল আর সময়ের চেয়ে সহজলভ্য জান্তব আর কিই বা আছে?? বলে ফেলেছিলাম, গত তিরিশ বছর ধরে একটা দ্বিচারিতা সুসজ্জিতা বারাঙ্গনার মতো জঙ্গলের গাছে ঠেস দিয়ে খদ্দের ধরেছে প্রতিদিন। খদ্দের মানেই তো সভ্যতার সন্তান, তা এই জঙ্গলে সভ্যতার সন্তান??!!! হ্যাঁ, কিলবিল করছে, তারা কোন শিকারী নয়, তারা শুধুমাত্র চোরা। এই চোরাজগতের মধ্যে আমরা সকলে থেকেছি, ঘুরেছি, চড়ুইভাতি করেছি, দাদরা-কাজরি-ঠুমরি করেছি, শুধু খেয়াল করিনি। একে আমি বলেছি দ্বিচাবাদ। লেখাকে এই বাদ আমরাই দিয়েছি।

বলেছি কবিতার কোন বিষয় হয়না। জংলী বললে তবু একটা চেহারা ভাসে চোখে, সেটা ছোটবেলা থেকে সভ্যতার শেখানো বদভ্যেসের দরুন। আমরা কবিতাকে বলেছি বিমূর্ত, জঙ্গুলে। জঙ্গলে হায়না ঘটে, হায়নার হাসিও ঘটে। হায়নাও কবিতা, হায়নার হাসিও কবিতা। জঙ্গলের কোন দরজা হয়না যা খোলা রাখা যাবে, ফলে এসেছে সবাই। আমরা কোন ফারাক করিনি তার মধ্যে, রাখিনি কোন মাপদন্ড, বলেছি সৎ ও অসৎ। ফলে চোরাশিকারী কখনোই কবিতা হতে পারেনি, ট্যুরিস্টও পারেনি কবিতা হয়ে উঠতে। এতদূর অবধি ঠিক চলছিল, কবিতাকে সভ্যতার (প্রথাগত শিক্ষার) মেকী পোশাক আশাক, যেমন প্রথাগত ছন্দ, মাত্রার বন্দিশ, ইত্যাদি ছাড়িয়ে করলাম নতুন ও আরন্যক। বললাম, কবিতা ছড়িয়ে আছে সর্বত্র, কবি শুধু তাকে খুঁজে এনে লিপিবদ্ধ করেন। খুব ঠিক কথা, জঙ্গলে অবিশ্রান্ত ঝোরার মতো জঙ্গুলে ঘটনা ঘটে চলেছে। কখনো শিমূল গাছের ডালে উড়ে এসে বসলো ব্লু ম্যগপাই আর ঠিক তক্ষুনি একটা শিমূল ফল ফেটে তুলো উড়ে এসে পড়লো নীচ দিয়ে প্যারেড রত কাঠপিঁপড়ের দলের রাণীর মাথায়, রাণী পিঁপড়েদের ভাষায় বললো “বাঞ্চোত”। হয়ে উঠলো একটা আগে না ঘটা নতুন ঘটনা, তার জন্য বরাদ্দ হয়ে গেল কয়েকটি শব্দ… কখনো সকাল থেকে দুপুর অবধি খুঁজে খুঁজে পাওয়া মৌটসটস ফুলটি হঠাৎ হারিয়ে ফেলা প্রজাপতির চীৎকার… কখনো নদী পেরোবার সময় গায়ে ঠান্ডা জল লেগে হরিণশরীরের রোমাঞ্চ। এইবার এলো দ্বিচারিতা। আমরা মুখে বলেছি এদের মধ্যে তুলনা হয়না। সত্যিই হয়না। কিন্তু মনবাবু বানিয়ে ফেলছে লিস্টি। সে লিস্টিতে প্রজাপতির আর্তনাদ বসছে হরিণের রোমাঞ্চের আগে। সে বলছে কুমীরের হরিণশিকার এমন কি?? কমন, কমন… তার থেকে সকালের প্রথম ঘাসের দিকে হরিণের এগিয়ে যাওয়া মুখের এক্সপ্রেসান দেখেছ… মুখে বলছি সর্বত্র ঘটছে কবিতা, কিন্তু মনে আনছি তার মধ্যে তারতম্য… সল্ট লিকে নুন চাটতে আসা বাইসন দেখে বলছি এতো ট্যুরিস্টদের জন্য, ওই জন্যই তো সল্ট লিক আছে, এর থেকে অনেক সুক্ষ্ম শজারুর অকারনে রুমঝুমি নাচ… গাছ থেকে অদ্ভূত এ্যাঙ্গেল করে নেমে আসা পাতাটি লিপিবদ্ধ করাকে বসাচ্ছি গাছে উড়ে এসে বসা বিরল প্রজাতির পাখিকে লিপিবদ্ধ করার নীচে… জলদাপাড়ায় ঢুকে এক্সপেক্ট করছি গণ্ডার, আর যদি বাইচান্স দেখে ফেলি বিষাদ আক্রান্ত একলা স্ত্রী গণ্ডার, বলছি কেয়া বাত… আর ঢোকার সময় যে বাছুরটা রাস্তা ছেড়ে দিল তোমাকে, সে পড়ে রইল তলানিতে। এবং এই কর্ম চোরাপথে কবিতায় সাপ্লাই দিচ্ছে বিষয়, আমাদের অজান্তে। এই এক ফলাফল। আর দ্বিতীয় ফলাফল হলো সকলেই খুঁজছে বিরল নমুনা, ফলে এন্তার জংলী বিরল আমাদের চোখের সামনে, প্রত্যেকটি ওয়াও। চতুর্দিকে জংলী বিরল, এর ফাঁকে যে লিপিবদ্ধ করেছিল উদাসীন জংলী বিড়াল, তাকে বললাম, দেখো দেখো, আরো দেখো, কত কি নতুন দেখতে পাবে এই অরন্যে। জঙ্গলে শুধু শুকনো পাতার খসখস আর উপুড় পূর্ণিমা না দেখে চোখ চালাও, কতো কি নতুন সমারোহ দেখতে পাবে তার ইয়ত্তা নেই। এই শুনে পাশের গুণধর বললে, জানো তো খসখস ঘর ঠান্ডা রাখে। ব্যাস, অসাধারণ, এই হচ্ছে দেখা, অন্য চোখে দেখা।

ছেলেটি আর মুখ ফুটে বলতে পারলে না যে সে কিন্তু জংলী বিড়ালটির মধ্যে লাবণ্য পেয়েছে, সেই প্রাণীটির আঙ্গিক অবিকল ছিল তার পুরানো প্রেমিকার মতো। এবং এই অবস্থার কারন আর কিছুই না, মনের নিজেকে টার্জান বা অরণ্যদেব ভাবা। কেউ দেয়নি, তবু তুমি নিজে নিয়ে নিয়েছ এই জীবিত বস্তু ভরা অরণ্যের রক্ষনাবেক্ষনের ভার। তুমি পুষে ফেলেছ দুখানা ডলফিন, নাম দিয়েছ তাদের সলোমন আর নেফারতিতি। কি নতুন হলো এই জীবিত ঘটনা!! আর যে নতুন কিশোর টার্জান, যে স্বপ্ন দেখেছে আর একটানা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে একটা প্যাঙ্গোলিন পোষার, যার নাম দেবে সে হরিমাধব, তাকে বলছো নাজুক, নাজুক। তুলে দিচ্ছ প্রণতি নামক শালগাছটির ডগায়, বলছো দেখ পাখির চোখে দেখা, দেখা বদলে যাবে তোর। আর যে জংলী বিড়ালকে “ওয়ে জংলী বিল্লি কাটনা মত্” বলে দেখেনি বরং গিলেছে তার ভ্রুকুঞ্চন, তাকে দিচ্ছ মার্কশীট, ভালো রেজাল্ট করার এনথু। যে হরিনকে হিরন বলে ডেকে দেখছে তার পালানো দ্রুততর হয় কিনা, তাকে দিচ্ছ উপদেশ, অন্তত কেমন ধ্বনিতে হরিনের চোখে আসে জল, তা দেখ বেটা। কবিতার ক্লাশ হয়না বলে তাকে বলছো হরিনার চঞ্চলতা তো সবাই দেখে, তুই দেখ অন্য কিছু, দেখনা হরিনের ল্যাদ, যদি খুঁজে পাস। এটা কি??? এটাই চলছে গত তিরিশ বছর। মুখে বলছি, সবাই সবাই, সব সব। কিন্তু জঙ্গলে প্রথম পা দেওয়া ক্যামেরা হাতে মেয়েটিকে বলছো ক্যামেরা ছুঁড়ে ফেল, চোখ দুটোকে পিঠের ওপর রেখে তা বইতে বইতে হাঁট, পায়ের পাতা ঘুরিয়ে নিয়ে পর, আঙুলগুলো চুলের সাথে বাঁধ, দিয়ে বেরো… একটু ভেতরে গেলে ব্রায়ের দাগ ছাড়া কিছুই পরিস না বুকে… তুমি জানতেও চাওনি, তাই জানোইনা, ও কিন্তু ওর ক্যামেরাটাকে পোষা জন্তু বলে ভাবে, যে জন্তু খচাস শব্দে ডাকে


লেখা অংশ-

নতুন যদি, কেন তবে শাহেনশা তারতম্য খান এর দোর্দ্দন্ডপ্রতাপ? কেন তার কর দিতে হয়? যদি সত্যি কেউ সৎ ভাবে লেখে, তবে সে খারাপ লিখতে পারেনা… তুমি তার লেখার মধ্যে অপুর ভালোনাম খুঁজে পাচ্ছোনা, শুধু খুঁজে পাচ্ছো নিশ্চিন্দিপুর আর তাকে বলছো, বড্ড ফ্ল্যাট আগে প্রচুর হয়েছে, এটা তোমার মঞ্চে স্পটলাইট দেখার অভ্যেস, পাশের হাল্কা অন্ধকারে কিভাবে চেয়ার টেবিল সরিয়ে সেট বদল হচ্ছে সেটা দেখার অভ্যেস তোমার নেই, এটা তোমার দূরবীনের দেয়াল। তোমার বায়নোকুলার দিয়ে পাখি বড় করে দেখার অভ্যেস, হঠাৎ খালি চোখের সামনে বাজপাখি এসে বসলে, তোমার “অন্য” খোঁজা চুলোয় যায়… ভাবো চোখে এতদিনে অদৃশ্য দূরবীন গজিয়েছে, আত্মহারা হয়ে দুরান্ত নামক ল্যাবরেটরিতে তোমার সাপ্লায়ারকে নানান ধ্বনি ও শব্দের ফরমাইশ করো।

(বাদবাদ) ইজমিজমে তুমি নেই… কোনরকম বাদ তুমি রাখোনি জীবনে (তোমার হাত নেই, তবুও বাক্যটি পিঠের রুকস্যাকে আরেকটি মানে এনে ধপ করে নামিয়ে রেখেছে)… এবার পৃথিবী দুভাগ, তুমি আর অতুমি। সেই অতোমার পৃথিবী তোমাকে নোইজ্মে (noism) বিশ্বাসী দেখে। এতে তুমি কিছুই করতে পারোনা। সকালে তোমার কাকটিকে বাদ দিতে ইচ্ছে হয়, দোয়েলকে নয়, এও কি বাদ নয়?

খেলতে যাওয়া কেউ তোমাকে শেখায়নি, পড়তে বসা রীতিমতো অনুষ্ঠান, হাতে খড়ি ঘটে সে ঘটেছে।

একই রকম ত্রুটি খোঁজা শিখতে হয়নি, কিন্তু ভালো খোঁজা একটা আর্ট যার রেওয়াজ প্রয়োজন নিয়মিত। ভালো খোঁজা অরূপতালে বাজে। সে বাজনা শুনতে শোনাতে এক কাবিলিয়ৎ লাগে। এক অজানা পাড়াতে ঘোর দুপুরে তুমি প্রত্যেকজন দরজায় কড়া নেড়ে যাও, প্রতিটি অভ্যর্থনা সে যেমনই হোক তোমার কাছে চরম উত্তেজনা আনে, কেননা এরাই রাত্রে খাতায় নেমে আসবে আগে কখনো না হওয়া হুরী, পরী, নটী হয়ে, ঘাড়ধাক্কা হয়ে উঠবে এক অভূতপূর্ব শিরস্ত্রান, স্লাইট নামানো নীচে…

বিভাগ:লেখা ও ললিতা

উচ্চারণ ওয়েব ম্যাগাজিন

কথাদের স্পর্ধা

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s